
ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ আমি সমাজমাধ্যমে ভাগ করে নেওয়ার খুব একটা পক্ষপাতী নই। তবুও এক সপ্তাহ আগে এমন একটা ঘটনা ঘটে, যা আমার জীবনকে প্রায় উলটপালট করে দিয়েছে।
গত সাড়ে এগারো বছর ধরে আমার বিশ্বস্ত সঙ্গী ছিল লাকি—একটি ল্যাব্রাডর। ও কেবল কুকুর ছিল না, ও ছিল আমার সন্তান। কিছুদিন ধরেই বেশ কষ্ট পাচ্ছিল, ভুগছিল। শেষ তিন দিন তো পুরোপুরি খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। ঘুমোতেও পারছিল না; সারাদিন-সারারাত কেবল চক্রাকারে ঘুরে বেড়াত। তখন মনে হচ্ছিল, মৃত্যুই হয়তো একমাত্র ওকে এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে পারে। বাড়ির সবাই আমরা মনে মনে চাইছিলাম ও যেন কষ্ট থেকে মুক্তি পায়।
গত শুক্রবার ওর রক্ত পরীক্ষা করানো হয়। শনিবার রিপোর্ট নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেলে ধরা পড়ে যে রক্তে ক্লোরাইডের মাত্রা অত্যধিক, অর্থাৎ ওর শরীরের অভ্যন্তরীণ কোনো অঙ্গ অকেজো হয়ে গেছে। ওকে বাড়ি নিয়ে আসি। অসহ্য যন্ত্রণার মধ্যে একে একে মুখ দিয়ে রক্ত বেরিয়ে, হার্ট অ্যাটাক হয়ে দুপুরবেলা ও আমাদের ছেড়ে চলে যায়।
এই ক্ষতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। লিখতে গিয়ে কত কথাই না মনে পড়ে যাচ্ছে! ছোট্টবেলায় তুলোর পুতুলের মতো এক বিঘত সাইজের লাকি আমাদের ঘরে এসেছিল। তখন ওকে একটা পিচবোর্ডের বাক্সে রাখা হয়েছিল, কিন্তু দু’মিনিটের মধ্যেই ও বাক্সটা উল্টে বাইরে বেরিয়ে আসে। ছোটবেলায় খুব দুষ্টু ছিল। কাজ থেকে ফেরার পর মা প্রায়দিনই ওর নামে নানা অভিযোগ করতেন। কিন্তু ওকে বুকের ওপর নিয়ে যখন আদর করতাম, ওর দুটো নিরাপদ চোখ আমার দিকে গভীর বিশ্বাসে তাকিয়ে থাকত। আমরাই তো ছিলাম ওর বাবা-মা, আর আমার মেয়ে—ওর দিদি—ছিল ওর খেলার সঙ্গী।
বাগানটা ওর ভীষণ প্রিয় ছিল। কত স্মৃতি! বাইরে থেকে যখন বাড়ি ফিরতাম, বাগান থেকে সদর দরজা পর্যন্ত ও আমার পাশে পাশে হেঁটে আসত—ঠিক যেন ‘গার্ড অব অনার’ দিচ্ছে! চা খাওয়ার সময় কী করুণ চোখে তাকিয়ে বিস্কুট চাইত; খেতে ও বড্ড ভালোবাসত। সেই লাকি শেষ তিন দিন এক ফোঁটা জল পর্যন্ত মুখে তুলতে পারেনি। ও মুক্তি পেয়েছে, মৃত্যু ওকে যন্ত্রণা থেকে নিস্তার দিয়েছে—হয়তো সেটাই ওর জন্য ভালো হয়েছে। কিন্তু আমরা যে নিদারুণ কষ্টের মধ্যে পড়ে রইলাম!
ও ছিল আমাদের বাড়ির ‘হ্যাপিনেস অফিসার’। মজা করে প্রায়ই বলতাম, বাড়িটা আসলে ওরই, আমরা শুধু এখানে থাকি। এমনকি কুরিয়ারের লোকজনও ফোন করে বাড়ি চিনতে না পারলে বলত, “ওহ, সাদা ল্যাব্রাডর আছে যে বাড়িটায়?” আমাদের ঠিকানাটাই যেন ওর নামে হয়ে গিয়েছিল। এরা তো বেশিদিন বাঁচে না, বড়জোর বারো-তেরো বছর। একদিন বিদায় নিতই, কিন্তু এই শোক যে মেনে নেওয়া কতটা কঠিন!
পোস্টের সাথে যে ছবিটা দিলাম, সেটা ২০১৯ সালের ২৮শে ডিসেম্বর ওর জন্মদিনে তোলা। কেকটা কখন খেতে পাবে, সেই আশায় কী শান্ত আর নিরীহ মুখ করে বসে আছে দেখুন।
আর কী-ই বা বলব! বলার মতো আর কোনো ভাষা নেই।
ভালো থেকো, লাকি।
