


কালকের দিনটা ছিল যাকে বলে নিখাদ হরর-কমেডি সিনেমার চিত্রনাট্য! মেয়ের পিএইচডি ইন্টারভিউয়ের জন্য গেলাম ডায়মন্ড হারবার উইমেন্স ইউনিভার্সিটিতে। দূর থেকে দেখে মনে হলো মাঠের মধ্যে কেউ হয়তো আকাশ আর সমুদ্রকে মিক্সিতে পিষে ঢেলে দিয়েছে—গাঢ় আর হালকা নীলের এমন এক এলাহী রঙের ককটেল বিল্ডিং! গেটে সেন্ট্রি খাতা এগিয়ে দিয়ে নাম লেখাল বটে, কিন্তু ভেতরে পা রাখতেই মনে হলো পৃথিবী থেকে মানবজাতি হঠাৎ ভ্যানিশ হয়ে গেছে! চারদিকে পিনপতন নিস্তব্ধতা, লিফট আর দেওয়ালগুলো চকচক করছে, অথচ জনমানবহীন এই প্রাসাদ দেখলে যে কারও মনে হবে ভুল করে সায়েন্স-ফিকশন সিনেমার ভূতুড়ে স্পেস স্টেশনে ঢুকে পড়েছি।
চিঠিতে লেখা ছিল চারতলার এক নির্দিষ্ট ঘরে ইন্টারভিউ। স্নাইডার কোম্পানির ঝকঝকে লিফটে চড়ে চারতলায় উঠে দেখি, ইন্টারভিউ নেওয়া তো দূর, ঘরের দরজাতেই ঝুলছে মস্ত তালা! অগত্যা পাশের খোলা দরজা দিয়ে উঁকি মেরে দেখি—হলিউডি সিনেমার ক্লাসরুম! স্মার্ট বোর্ড, ঝাঁ-চকচকে প্রজেক্টর, আধুনিক বেঞ্চ—সব মজুত, শুধু ছাত্র আর মাস্টারের বালাই নেই। মেয়ে ওখানেই সদ্য পরিচিত হওয়া এক বান্ধবীর সাথে আসন পাতল, আর আমি নিচে নামতেই এক গার্ড সদয় হয়ে বিধান দিলেন, “যান, ক্যান্টিনে গিয়ে বসুন”। গিয়ে দেখি সে এক অপূর্ব ‘বিমান’ মার্কা নরককুণ্ড; পাখা ঘুরছে ঠিকই, তবে স্বস্তি দেওয়ার চেয়ে বাতাস তাড়াতেই যেন বেশি ব্যস্ত। ভাবলাম জান বাঁচানো ফরজ, তাই সোজা গাড়িতে ঢুকে এসি চালিয়ে ইউটিউব দেখেই মোক্ষলাভ করলাম।
ঘণ্টাখানেক বাদে মেয়ে নেমে এসে বলল, ইন্টারভিউ ভালোই হয়েছে, দেখা যাক রেজাল্ট কেমন হয়। যাই হোক, এই বিপুল মানসিক চাপের পর পেটপুজোর কম্পেনসেশন তো চাই-ই! সোজা গাড়ি হাঁকালাম ডায়মন্ড হারবার নদীর ধারে দেবুর হোটেলে। এসে পৌঁছল রাজকীয় সাইজের ইলিশ ভাপা—সাইজ দেখে চক্ষু চড়কগাছ হলেও স্বাদে বুঝলাম মাছটি হয়তো মেধা কোটায় নয়, স্রেফ সুপারিশে পাতে উঠেছে! তবে আসল বাজিমাত করল দুশো কুড়ি টাকার ভেটকির পাতুরি—একেবারে পয়সা উসুল স্বাদ!
এরপর নিরিবিলি সবুজ রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালিয়ে ব্রিটিশ কাউন্সিলের লাইব্রেরি ঘুরে রাত সোয়া আটটায় যখন ঘরে ফিরলাম, তখন একটাই দীর্ঘশ্বাস পড়ল—কোটি টাকার অবকাঠামো পড়ে ধুলো খাচ্ছে শূন্যতায়, আর আমাদের সাধারণ কলেজগুলো একটা ভালো প্রজেক্টরের জন্য চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকে! সব মিলিয়ে দিনটি ছিল বিলাসিতা আর অপচয়ের এক অদ্ভুত হাসির খোরাক।
